সপ্তানব্বইতম অধ্যায়: নিখুঁত তলোয়ার
লোহার দেশের নিজস্ব কোনো নিনজা নেই, বরং তাদের আছে একধরনের বিশেষ সামুরাই। যদিও এই সামুরাইরাও নিনজাদের মতোই নানা প্রকৃতির চক্রা ধারণ করে, তাদের যুদ্ধের পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা। নিনজারা চক্রাকে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রণে এনে জাদু ও বিভ্রম সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে আঘাত করে। অথচ সামুরাইরা নিজেদের চক্রা তরবারিতে প্রয়োগ করে, যার ফলে সৃষ্টি হয় তীক্ষ্ণ তরবারির আঘাত। এ কারণেই তাদের শক্তি সীমিত। বিশেষত যখন আগুন ছায়ার যুগের শেষভাগে পৌঁছানো যায়, তখন নানান ধরনের নিনজা কলার প্রচণ্ড আঘাতে সামুরাইরা বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে। এমনকি লোহার দেশের সর্বশক্তিশালী সামুরাই, মিফুনও খুব বেশি কিছু করে দেখাতে পারেনি।
তবুও, যদি আমি এদের যুদ্ধের পদ্ধতি আয়ত্ত করতে পারি, তাহলে হয়তো সাধারণত্ব থেকে বিশেষত্বে উত্তরণ ঘটবে কিনা কে জানে। ক্ষীণভান চুপচাপ রিকাকুর পেছনে চলতে চলতে এমন চিন্তা করতে লাগল। আমার চক্রা সাধারণ মানুষের তুলনায় বেশি, যদি আমি চক্রা তরবারিতে সঞ্চারিত করি ও তরবারির আঘাত সৃষ্টি করি, তাহলে হয়তো সেটি অতিমানবীয় শক্তিতে পৌঁছাতে পারে। সুযোগ পেলে পরীক্ষা করে দেখব।
ঠিক এমন সময়, যখন ক্ষীণভান নানা চিন্তায় বিভোর, রিকাকু তাদের সাথে নিয়ে বনভূমি পার হয়ে লোহার দেশের এক নগরে পৌঁছাল। মিফুনের দেহরক্ষী হিসেবে রিকাকু আগেই তার নির্দেশ অনুসারে সারুতোবি হিরুজেন প্রমুখের থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছিল।
‘‘আপনাদের দীর্ঘ সফর ক্লান্তিকর ছিল, মিফুন-সামা বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন, আপনারা যেন ভালোভাবে বিশ্রাম নেন এবং আগামীকাল থেকে আলোচনা শুরু হয়,’’ রিকাকু যথারীতি বিনীত ভঙ্গিতে কথাগুলো বলল।
যদিও লোহার দেশের শক্তি আগুন বা বজ্র দেশের মতো বড় ও শক্তিশালী নয়, তবুও একমাত্র দেশ হিসেবে যারা বহু যুদ্ধের মাঝেও নিরপেক্ষ থাকতে পেরেছে, তাদের আত্মবিশ্বাস প্রবল। আগুন ছায়া বা বজ্র ছায়া, কাউকেই মিফুন সরাসরি অভ্যর্থনা জানান না, তাঁর দেহরক্ষীর মাধ্যমেই বার্তা পাঠান। আলোচনা চলাকালীনই কেবল তিনি অভ্যর্থনা জানান।
‘‘বুঝেছি,’’ সারুতোবি হিরুজেন মাথা নাড়লেন, জানান তিনি ভালোভাবে বিশ্রাম নেবেন।
‘‘তাহলে আপনাদের আর বিরক্ত করব না, আমাকে মিফুন-সামার কাছে রিপোর্ট দিতে হবে,’’ বলল রিকাকু। এরপর সে সামুরাইদের অভ্যর্থনা জানিয়ে, কারো দিকে না তাকিয়েই সেখান থেকে চলে গেল।
‘‘বড্ড ক্লান্ত লাগছে, হোকাগে-সামা, আমি একটু বিশ্রাম নিতে চাই,’’ রিকাকুর চলে যাওয়া দেখে ক্ষীণভান আলস্যভরে হাই তুলল, যেন বিশ্রাম নেওয়ার জন্য সে আর অপেক্ষা করতে পারছে না।
‘‘ঠিক আছে,’’ হিরুজেন বিনা দ্বিধায় সম্মতি দিলেন, ‘‘ইয়ামানাকা, তুমিও সারাদিন পরিশ্রম করেছ, ভালোভাবে বিশ্রাম নাও।’’
‘‘ঠিক আছে, হোকাগে-সামা।’’
ইয়ামানাকা কাজু সরাসরি হিরুজেনকে সাড়া দিয়ে নিজের কক্ষে চলে গেল। ক্ষীণভানও আর কিছু না বলে, হিরুজেনকে বিদায় জানিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করল।
যদিও লোহার দেশ ধনী নয়, মিফুনের নেতৃত্বে সবাই শান্তিতে বসবাস করে। ঘরটি বিশেষ বিলাসবহুল নয়, কিন্তু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও গোছানো, সাধারণত ব্যবহৃত জিনিসপত্র সুশৃঙ্খলভাবে সাজানো।
ক্ষীণভান তক্তার ওপর পদ্মাসনে বসে, সঙ্গে সঙ্গেই শুভ্র নয়ন চালু করল। যদিও সে হাশিরামার চক্রা, পাঁচ প্রকৃতির জাদু ও কাঠ জাদু আয়ত্ত করেছে, তবুও অনুভূতি শক্তি তার দুর্বল দিক। কখনো কখনো তো সামনে থেকেও চক্রার সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝতে পারে না। তবে শুভ্র নয়ন থাকায় এই দুর্বলতা অনেকটা ঘুচেছে।
এই বিশেষ দৃষ্টি শক্তি চালু করতেই চারপাশের তিনশ ষাট ডিগ্রির সব কিছু স্পষ্ট ভেসে উঠল। যখন নিশ্চিত হল, কেউ তার ওপর গোয়েন্দাগিরি করছে না, তখন সে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে জিনিসপত্রের তালিকা থেকে তরবারি বের করল।
এ ধরনের অস্ত্র সে খুব কম ব্যবহার করেছে, তবে একেবারেই অপরিচিত নয়। তরবারিটি হাতে নিয়ে সামান্য ঘুরিয়ে দেখল।
‘‘অনুভূতিতে অন্যান্য অস্ত্রের চেয়ে খুব একটা পার্থক্য নেই,’’ নিজেই বিড়বিড় করল সে। এরপর চক্রা তরবারিতে প্রয়োগ করতে লাগল, দেখতে চাইল এর ফলে কোনো পরিবর্তন আসে কি না এবং তরবারিটি সত্যিকারের জাদুর তরবারিতে রূপান্তরিত হয় কি না।
কিন্তু সফল হল না।
‘‘বোধহয় স্বাভাবিক, আমি তো এই তরবারি সদ্য পেয়েছি, এত সহজে এটা আসল জাদুর তরবারি হয়ে যাবে—এটা তো হতে পারে না,’’ রূপালি ধারালো ফলার দিকে তাকিয়ে চক্রা সঞ্চার বন্ধ করল সে এবং তক্তা থেকে উঠে দাঁড়াল।
যদিও ছোট সহকারী এই তরবারিটি উপহার দিয়েছে, কিন্তু সঙ্গে উপযুক্ত মুড়ি দেয়নি।
‘‘ভাবতে গেলে, লোহার দেশ তো সামুরাইদের দেশ, এখানকার প্রতিটি সামুরাই স্তরে স্তরে বর্ম পরে, অন্তত দু’টি তরবারি রাখে, এখানকার লৌহশিল্প নিশ্চয়ই উন্নত,’’ মনে পড়তেই জানালার বাইরে তাকাল, তখনও সূর্য আকাশে উজ্জ্বল।
‘‘বাইরে একটু ঘুরে আসা যাক,’’ তরবারি কোমরে গুঁজে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল ক্ষীণভান।
যদিও দেশ আলাদা, আগুন ছায়ার এই বিশ্বে সবাই একই ভাষায় কথা বলে।
‘‘রাস্তায় বেশ ভীড়,’’ চারপাশে তাকিয়ে দেখল ক্ষীণভান। লোহার দেশ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও খুব একটা পিছিয়ে নেই। রাস্তার দু’পাশে নানা দোকানি, বিক্রেতা তাদের পণ্য বিক্রি করছে।
এছাড়া, সামুরাইদের দেশ হিসেবে, এখানকার লৌহশিল্প অত্যন্ত উন্নত। ক্ষীণভানকে রাস্তা জিজ্ঞাসা করতে হয়নি, চোখের সামনেই একটি লৌহকারের দোকান দেখতে পেল।
তারপর সে হাতে ধরা তরবারির দিকে চেয়ে দ্রুত পা বাড়াল।
‘‘নমস্কার,’’ দোকানের লৌহকার তাকে দেখেই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই তার দৃষ্টি তরবারির দিকে গিয়ে আটকে গেল।
মাত্র এক ঝলকেই লৌহকার বিস্ময়ে চোখ বড় করে ফেলল, ঠোঁটের কোণায় শীতল বাতাস ঠান্ডা হয়ে উঠল।
‘‘ঐ তরবারি...’’ গলা শুকিয়ে গিলল লৌহকার। পুরো লোহার দেশে সে নিজেকে যথেষ্ট অভিজ্ঞ মনে করে, সামুরাই গোষ্ঠীর অধিকাংশ অস্ত্রও তার হাতে গড়া।
কোনো অস্ত্রের জন্য ‘নিখুঁত’ শব্দটা তার একদমই প্রিয় নয়। কারণ প্রকৃত লৌহকারের কাছে সর্বোত্তম অস্ত্রটি ভবিষ্যতের।
কারণ প্রযুক্তি ক্রমাগত উন্নত হয়, উৎসাহ আর ঘামে দক্ষতা নিখুঁত থেকে নিখুঁততর হয়। এই বিশ্বাসই তাকে নিরন্তর চর্চায় ও পরিশ্রমে আগ্রহী রাখে।
কোনো অস্ত্রকে একবার নিখুঁত বললেই, সে যেন নিজের এতদিনের সাধনা ও ভবিষ্যতের পথকে অস্বীকার করে বসে—এটা একজন লৌহকারের জন্য বিশাল আঘাত।
তবুও, এইসব ভাবনা শুধু ক্ষীণভানকে দেখার আগ পর্যন্তই ছিল।
‘‘নিখুঁত...’’
চরম বিস্ময়ে তার মুখ থেকে শুধু এই কথাটাই বের হলো। নিজেকে ভাষাহীন মনে হচ্ছিল, কারণ এই অস্ত্রের তুলনা করার আর কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছিল না।
‘‘আমি...’’
‘‘আপনার তরবারিটি একটু দেখতে পারি?’’
সময় যেন এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল, লৌহকার এপ্রোনে কাঁপা হাত মুছে, তার দৃষ্টিতে ঝলকানি, যেন পছন্দের খেলনা দেখে কোনো শিশু, কিন্তু অনুমতি না পাওয়ায় অস্থির।
ক্ষীণভান মনে মনে অবাক হল, এই তরবারি কি সত্যিই এত অসাধারণ?